• সোমবার, ২৫ অক্টোবর ২০২১, ০৯:২২ পূর্বাহ্ন
  • Bengali Bengali English English
নোটিশ :
* ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে দেশবাসীকে বীরযোদ্ধা অনলাইন পত্রিকার পক্ষ থেকে জানাই প্রাণ ঢালা অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা * বিভিন্ন বিভাগ, জেলা ও উপজেলাতে অভিজ্ঞ সংবাদকর্মী  আবশ্যক। আগ্রহীদের নিম্নে ঠিকানায় যোগাযোগ করার জন্য জানানো যাচ্ছে।

’রসিদা বিড়ি’ ফ্যাক্টরীর মাধ্যমেই ইদ্রিস মিয়ার অগ্রযাত্রা

বীরযোদ্ধা / ২১
প্রকাশিত : ৯:৩৩ পিএম, (বৃহস্পতিবার) ২২ এপ্রিল ২০২১

নাজমুল হোসাইন :

শেরপুর তথা বৃহত্তর ময়মনসিংহ বিভাগের অন্যতম প্রধান শিল্পপতি, দানবীর শিক্ষানুরাগী ও সমাজসেবক আলহাজ্ব ইদ্রিস মিয়া সবক্ষেত্রে তিলে তিলে নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন একজন সফল মানুষ হিসেবে। জিরো থেকে শুরু করে তিনি ওঠেছিলেন সফলতার উচ্চ আসনে। যিনি শুধু আমাদেরই নয় ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবেন। এ মানুষটি হঠাৎ করেই ১২ এপ্রিল আমাদের ছেড়ে চিরদিনের জন্য বিদায় নিয়ে চলে গেলেন না ফেরার দেশে। তার এ বিদায়ে হাজার হাজার মানুষ কেঁদেছেন এবং কাঁদছেন তাদের প্রিয় এ মানুষটির জন্য।

ব্যবসায়, শিল্প প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠায় ব্যাপক সাফল্য পাওয়ায় সাথে সাথে একজন শিক্ষানুরাগী ও দানবীর হিসেবে একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও দাতব্য প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দান খয়রাতের মাধ্যমে ব্যাপক অবদান রেখেছেন ময়মনসিংহ বিভাগের অন্যতম সেরা শিল্পপতি আলহাজ্ব ইদ্রিস মিয়া। অদম্য সাহস, সততা, বিশ্বস্ততার গুণেই তিনি একজন সফল মানুষ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। শেরপুর পৌরসভার অন্তর্গত ঢাকলহাটী কামারিয়া গ্রামে ইদ্রিস মিয়া এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে ১৯৫০ সালের ১০ ডিসেম্বর জন্ম গ্রহণ করেন। তার পিতা মরহুম আলহাজ্ব বাবর আলী ও মাতা মরহুমা মালেতন নেছা। ছয় ভাই বোনের মধ্যে তিনি মা-বাবার তৃতীয় সন্তান। শেরপুর শহরে ৩০নং রসিদা বিড়ি ফ্যাক্টরী প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তার জীবনের অগ্রযাত্রা শুরু হয়।

ছোটবেলা থেকেই পড়ালেখার পাশাপাশি তিনি ছিলেন শিল্পমনা। কাজ এবং কর্মীকে তিনি মনে প্রাণে ভালবাসতেন। ১৯৬২ সালে বিড়ি শিল্প বিষয়ে শিক্ষা লাভের জন্য স্থানীয় শ্রী জ্ঞানেন্দ্র মোহন দত্তের বিড়ি ফ্যাক্টরীতে চাকরি নেন। তিনি ওই ফ্যাক্টরীতে ৪-৫ বছর চাকুরি করে পুনরায় গ্রামের বাড়ীতে পৈত্রিক কৃষি কাজে আত্ননিয়োগ করেন। কৃষি কাজেও তিনি যথেষ্ঠ দক্ষতা ও সফলতা লাভ করে বাবার সন্তুষ্টি অর্জন করেন। ১৯৭১ সালের শুরুতেই ভাইদের সাথে পারিবারিক বিষয়াদি নিয়ে ঝগড়া হয়। ঝগড়ার এক পর্যায়ে ইদ্রিস মিয়া আহত হন। এ ঘটনার পরদিন সকাল বেলায় নাস্তা খেয়ে বাড়ী হতে মাত্র ২ আনা পয়সা নিয়ে পায়ে হেটে জামালপুর চলে যান। সেখানে তিনি আবার অন্য একটি বিড়ির ফ্যাক্টীতে চাকুরি নেন। কিছুদিন চাকুরি করার পর তার সততা ও দক্ষতা দেখে মধুপুর থানাধিন শুলাকুড়ি বিড়ি ফ্যাক্টরীর মালিক তাকে ম্যানেজার পদে চাকুরি দেন। ইতিমতো মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। ফলে তিনি আব্রা বাড়ীতে চলে যান। উল্লেখ্য শ্রী জ্ঞানেন্দ্র মোহন দত্তের বিড়ি ফ্যাক্টীতে চাকুরি করাকালিন একদিন ভুলে ইদ্রিস মিয়াকে ফ্যাক্টরীর কর্মকর্তা তাকে সোয়া এক আনা পয়সা বেশি দেন। তিনি বাড়ি গিয়ে দেখে তার কাছে এ পয়সা বেশি এসেছে। ওই অতিরিক্ত পয়সা মালিকের কাছে ফেরত দেন তিনি। এতে মালিক তার সততা দেখে মুগ্ধ হয়। পরবর্তীতে তার সততার কথা ভূলেননি মালিক শ্রী জ্ঞানেন্দ্র মোহন দত্ত। এক পর্যায়ে এদেশ ছাড়ার আগ মূহুর্তে আলহাজ্ব ইদ্রিস মিয়ার প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়ে বিড়ি ফ্যাক্টরী করার পরামর্শ দেয় এবং তিনি এই বলে আর্শিবাদ করেন ‘তুমি অনেক বড় হবে’।

তৎপর সরকারি বিড়ি লাইসেন্স প্রাপ্ত হয়ে নিজের বিড়ি ফ্যাক্টরী দিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। তিনি রাতে চোখে তেল দিয়ে বিড়ি তৈরী করতেন এবং দিনের বেলায় তা বিক্রি করতেন। নিরলস সাধনা ও কঠোর পরিশ্রমের ফলে তিনি একজন সফল শিল্পপতি হিসেবে সফলতার উচ্চ শিখরে পৌছতে সক্ষম হয়েছিলেন। অনেক বাধা বিপত্তির মধ্য দিয়ে দুই এক জন বিড়ির কারিগর দিয়ে বিড়ি শিল্পটিকে ধীরে ধীরে উন্নতির দিকে অগ্রসর করতে থাকেন।

তার সাথে প্রথম কারিগরদের একজন আহালি মিয়া। ১৯৭১ সালে রসিদা বিড়ি প্রতিষ্ঠা করে শিল্পটিকে বৃহৎ আকারে তৈরী করতে সক্ষম হন তিনি। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি এদেশের বিড়ি শিল্পে অগ্রগামী ব্যবসায়ীদের মধ্যে অনত্যম হয়ে ওঠেছিলেন। শেরপুর জেলার অন্যতম প্রধান শিল্পপতি ও শিল্প উদ্যোক্ত আলহাজ্ব ইদ্রিস মিয়াকে প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন ইদ্রিস গ্রুপ অব কোম্পানীজ নামে এক কোম্পানী। ওই কোম্পানী বিগত ১৯৮৫ সালে জয়েন্ট ষ্টক কোম্পানী হতে নিবন্ধিত হয়ে সুদক্ষ পরিচালক দ্বারা সুনামের সাথে কার্যক্রম চালাচ্ছে। শেরপুর জেলা সদরের জেলা হাসপাতাল রোড, নারায়নপুর প্রতিষ্ঠানটির মূল অবস্থান।

এরপর ১৯৭৩ সালে একটি রাইস মিল ও একটি প্রেস প্রতিষ্ঠা করে ব্যবসাকে আরও সম্প্রসারণ করেন।

এসবের মূলে তার কঠোর পরিশ্রম ও নিরলস সাধনা ছিলো। তার নিরলস সাধনা ও কঠোর পরিশ্রমে তিনি গড়ে তুলেছেন ১০-১২ টি কোম্পানী। একমাত্র পুত্র গুলজার মোহাম্মদ ইয়াহ্ ইয়া জিহান এর নামে জিহান এন্ড কোম্পানী প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন। এ কোম্পানীর অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠান হচ্ছে (১) তামাক ক্রয় কেন্দ্র, রামগঞ্জ, মন্থনা, হাজিরহাট, রংপুর, (২) তামাক ক্রয় কেন্দ্র গংগাচুড়া (৩) তামাক ক্রয় কেন্দ্র, রামগঞ্জ, নীলফামারী।

ওই কোম্পানীর পরিচালক হিসেবে দক্ষতার সাথে তার দায়িত্ব পালন করেছেন আলহাজ্ব মিসেস রেহানা ইদ্রিস এবং এ প্রজন্মের তরুন শিল্পপতি তার একমাত্র পুত্র জনাব গুলজার মোহাম্মদ ইয়াহ্ ইয়া জিহান। গুলজার মোহাম্মদ ইয়াহ্ ইয়া জিহান বর্তমানে বাবার মৃত্যুর পর ওই কোম্পানীর চেয়ারম্যান হিসেবে বাবার স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন।

শেরপুর জেলার বিস্তৃর্ণ এলাকা জুড়ে রয়েছে গারো পাহাড়। পাহাড়ি এলাকার লোকজন কর্মের অভাবে দারিদ্রতার অনেক নীচে বাস করে। ফলে পাহাড়ি এলাকার মানুষের কর্মসংস্থানের জন্য শিল্পপতি ও শিক্ষানুরাগী আলহাজ্ব ইদ্রিস মিয়া পাহাড়ে প্রতিষ্ঠা করে গেছেন জি এস রাবার প্রকল্প। ৫৪ একরএলাকা জুড়ে প্রতিষ্ঠিত এ রাবার বাগানে কর্মসংস্থান হয়েছে শতশত পাহাড়ি মানুষের। শেরপুর জেলা শহরের শেখহাটী নামক স্থানে এক মনোরম পরিবেশে গড়ে তুলেছেন জিহান অটো রাইস মিলস্ লিমিটেড নামে অত্যাধুনিক রাইস মিল। আধুনিক প্রযুক্তি সম্পন্ন উন্নতমানের মেশিন দ্বারা বাছাই করে নাজির, আতপ, মিনিকেটসহ বিভিন্ন চাল উৎপাদন হচ্ছে ওই মিলে। ওই চাল ঢাকাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ হয়ে থাকে। বিভিন্ন সংবাদপত্র, টিভি চ্যানেলে ওই রাইস মিলের প্রচার কাজ দীর্ঘদিন যাবত চলছে।

আলহাজ্ব ইদ্রিস মিয়া তার জন্মস্থান ঢাকলহাটী, কামারিয়াতে বৃহদাকার ১০টি পুকুর খননের মাধ্যমে গড়ে তুলেছেন জেবিন ফিস এন্ড ফিডস্ লিমিটেড নামক এক প্রকল্প। ওই প্রকল্পের চাষকৃত মাছ সরবরাহ করে শেরপুর জেলা তথা অত্রাঞ্চলের মাছের ঘাটতি পুরনে সহায়ক ভূমি রেখে চলেছে।

এ ছাড়াও আলহাজ্ব ইদ্রিস মিয়া শেরপুরবাসির পুষ্টি যোগাতে তিনি লছমনপুর গড়ে তুলেছেন এক বৃহৎ দুগ্ধ খামার। যাহার নাম জিহান ডেইরী ফার্ম। সেখানে গরুর উৎপন্ন দুধ এ জেলা শহরের প্রতিটি ঘর ও মানুষের মুখে মুখে।

শেরপুরে রয়েছে উন্নতমানের জিগজাগ ইটভাটা। তার এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। কর্মসংস্থানের দিক থেকেও তিনি বৃহত্তর ময়মনসিংহের মধ্যে অন্যতম সেরা।

শিক্ষা বিস্তারেও তার রয়েছে বিরাট অবদান। শিক্ষানুরাগী আলহাজ্ব ইদ্রিস মিয়া তার এলাকার তথা শেরপুরবাসির ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া করার জন্য নিজ অর্থায়নে গড়ে তোলেছেন জিহান প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং তার পিতার নামে আলহাজ্ব বাবার আলী উচ্চ বিদ্যালয়। সেখানে শতশত পরিবারের সন্তান লেখাপড়া করে শিক্ষিত সমাজ গড়ে উঠছে। বর্তমানে বিদ্যালয় দুটির একটি সরকারী প্রাথমিক অপরটি এমপিওভূক্ত হয়েছে।

শেরপুর শেখহাটীতে এক মনোরম পরিবেশে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন ইদ্রিসিয়া কামিল (এমএ) মাদ্রাসা। যে মাদ্রাসাটি শিক্ষা বোর্ড ও বাংলাদেশ আরবী বিশ্ববিদ্যালয়ের টপ ২০ এ রয়েছে।

এ ছাড়া ২০১৫ সালে তিনি জেলা শহরের প্রাণ কেন্দ্র নারায়ণপুরে বৃহদাকার ভবন সম্বলিত এবং মনোমুগ্ধকর পরিবেশে গড়ে তোলেছেন রেহানা ইদ্রিস মডেল একাডেমি নামে একটি স্কুল। লেখাপড়ার প্রতি তার প্রচুর আগ্রহ থাকায় তিনি সমাজ ব্যবস্থাকে শিক্ষিত সমাজ গড়ার লক্ষে দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে এ বিদ্যালয় স্থাপন করেছেন।

এছাড়াও শেরপুর জেলাসহ বিভিন্ন স্থানে শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে তার দানের অন্ত নেই।

উচ্চ মেধা এবং কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে একের পর এক কোম্পানী স্থাপন করত তিনি প্রতিষ্ঠা করে গেছেন ইদ্রিস গ্রুপ অব কোম্পনীজ লিমিটেড। রাজধানী ঢাকায় কর্পোরেট অফিস রয়েছে। শৈশবে তিনি ঘরে বসে প্রফেসর শ্রী ফনি ভূষন সাহার সাহায্যে পড়াশুনা করে এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছিলেন। এলাকার মানুষের কাছে আলহাজ্ব ইদ্রিস মিয়া একজন দানবীর হিসেবে পরিচিত।

তিনি দেশের বহু জেলায় মসজিদ, মাদ্রাসা, মন্দির, গীর্জা, ঈদগাহ্ মাঠসহ বিভিন্ন স্থানে লাখ লাখ টাকা দান করে গেছেন। ব্যবসার ফাঁকে আলহাজ্ব ইদ্রিস মিয়া একজন সাংবাদিক। নিরপেক্ষ নতুনযুগ পত্রিকা অনলাইন নিউজ পোর্টাল নতুন যুগ ডট কমের সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি হিসেবে দায়িত্বও পালন করেছেন। শেরপুর জেলা ট্রাক মালিক সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, ইটভাটা মালিক সমিতির সভাপতি, জেলা রোটারী ক্লাবের পি,এইচএফ ডিগ্রিধারী পি,পি, বাংলাদেশ এফ,বি,বি,সি আই এর সাধারণ সদস্য, শেরপুর আফছর আলী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় এবং তেরা বাজার জামিয়া সিদ্দিকীয়া মাদ্রাসার দাতা সদস্য। সূধী সমাজে তার স্থান অনেক ঊর্ধ্বে। পারিবারিক জীবনে আলহাজ্ব ইদ্রিস মিয়া সুখী ও সুপ্রতিষ্ঠিত ছিলেন। তাই সবার মাঝে তিনি দানবীর ও ইদ্রিস গ্রুপের চেয়ারম্যান হিসেবে পরিচিত ছিলেন।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর