• সোমবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৪:২৭ পূর্বাহ্ন
  • Bengali Bengali English English
নোটিশ :
* ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে দেশবাসীকে বীরযোদ্ধা অনলাইন পত্রিকার পক্ষ থেকে জানাই প্রাণ ঢালা অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা * বিভিন্ন বিভাগ, জেলা ও উপজেলাতে অভিজ্ঞ সংবাদকর্মী  আবশ্যক। আগ্রহীদের নিম্নে ঠিকানায় যোগাযোগ করার জন্য জানানো যাচ্ছে।

ফকির আলমগীরের চির প্রস্থান : ভাঙ্গায় শোকের ছায়া

বীরযোদ্ধা / ৫৮
প্রকাশিত : ৩:৫০ পিএম, (শনিবার) ২৪ জুলাই ২০২১

মাহমুদুর রহমান তুরান :

গানে গানে যিনি মানুষের কথা বলতেন, শোষণ-নিপীড়নের বিরুদ্ধে যার কণ্ঠ জ্বলে উঠত সেই ফকির আলমগীর আর নেই। চলে গেলেন না ফেরার দেশে। গণসংগীতের কিংবদন্তি শিল্পী মুক্তিযোদ্ধা ফকির আলমগীর যিনি লড়াই করেছেন অসংগতির বিরুদ্ধে। অবশেষে তিনি লড়াই করে করোনার কাছে হেরে গেলেন (ইন্নালিল¬াহি … রাজিউন)।

তার মৃত্যুর খবরটি নিশ্চিত করেছেন ছেলে মাশুক আলমগীর রাজীব।

সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন- অবশেষে নক্ষত্রের পতন। কিংবদন্তি গণসংগীতশিল্পী বীর মুক্তিযোদ্ধা ফকির আলমগীর গতকাল (শুক্রবার) রাত ১০টা ৫৬ মিনিটে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে ফকির আলমগীরের বয়স হয়েছিল ৭১ বছর। তিনি স্ত্রী ও তিন ছেলে রেখে গেছেন।

ফকির আলমগীরের ছেলে মাশুক আলমগীর রাজীব জানান, শুক্রবার রাত ১০টার দিকে কোভিড ইউনিটে ভেন্টিলেশনে থাকা অবস্থায় ফকির আলমগীরের হার্ট অ্যাটাক হয়। কয়েক দিন ধরে ফকির আলমগীর জর ও খুসখুসে কাশিতে ভুগছিলেন। পরে তিনি চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। চিকিৎসকের পরামর্শ মতো কোভিড-১৯ পরীক্ষা করিয়ে জানতে পারেন তিনি করোনা পজিটিভ। সেদিনই তার শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। এরপর তাকে গ্রিন রোডের একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। ওই সময় নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) প্রয়োজন পড়লে সেখান থেকে তাকে গুলশানের একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তার ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা ছিল। এ কারণে জটিলতা বাড়তে থাকে। পরে আবার শারীরিক অবস্থা কিছুটা ভালোও হয়।

মাশুক আলমগীর জানান, রবিবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে বাবার অক্সিজেন স্যাচুরেশন ৪৫-এ নেমে আসে, যার কারণে চিকিৎসকরা তাকে ভেন্টিলেশনে নেওয়ার পরামর্শ দেন। ভেন্টিলেশনে নেওয়ার পর থেকে ফকির আলমগীরের অক্সিজেন স্যাচুরেশন ৯০-এ উন্নীত হয়। এক সময় রক্ত ও ফুসফুসে ইনফেকশন পাওয়া যায়। রক্তচাপ খুবই নেমে যায়। রক্তে ইনফেকশনের জন্য প্রায় প্রতিদিনই সকালে জ্বর আসছিল। শুক্রবার নতুন অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া শুরু হয়। এক পর্যায়ে রাতে আবারও অবস্থার অবনতি হয়। শেষ পর্যন্ত করোনার কাছে হার মানেন গণসংগীতের এই কিংবদন্তি শিল্পী।

ফকির আলমগীর ১৯৫০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা উপজেলার কালামৃধা ইউনিয়নের কালামৃধা গ্রামে জন্মগ্রহন করেন।। বাবা মোঃ হাছেন উদ্দিন ফকির ও মা বেগম হাবিবুন্নেসা। শিল্পী কালামৃধা গোবিন্দ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৬৬ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ঐতিহ্যবাহী জগন্নাথ কলেজে ভর্তি হন। সেখান থেকে স্নাতক ডিগ্রী লাভ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাংবাদিকতা ও গণযোগাযোগ বিভাগ থেকে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। ফকির আলমগীর ষাটের দশক থেকে সংগীতচর্চা করছেন। ছায়া সুনিবিড় একটি প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে বেড়ে উঠা এই সংগীত শিল্পী গ্রামের মেঠোপথ, ভাটিয়ালী, মুর্শিদী, পালাগান শুনে শুনে প্রবলভাবে সংগীতের প্রতিআকৃষ্ট হন। নিজ জেলায় পল্লী কবি জসিম উদ্দিন, আয়নাল মিয়া বয়াতি, হাজেরা বিবি, কানাই লাল শীল জন্ম হওয়ায় তার গানে লোকজ ঐতিহ্য খুঁজে পাওয়া যায়। তিনি লোকজ ঐতিহ্যে ওয়েষ্টার্ন পপ মিশ্রনে একটি ধারা তৈরী করেন। পোড় খাওয়া মানুষের জীবনকথা ধারন করে আধুনিকতার ছোয়ায় তিনি জনপ্রিয় সংগীত শিল্পীর তকমা পান। আবার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সংগ্রামী জীবনও তাকে টানে। তিনি অসাধারন বক্তৃতা করতে পারতেন। সুরধারায় গান গাওয়ার পাশাপাশি বাঁশিবাদক হিসেবে তার খ্যাতি ছিল। গান গাইতে মঞ্চে উঠলে প্রথমে তিনি বক্তৃতা করে বাঁশির সুরলহরী দিয়ে ভরিয়ে দিতেন। বলতেন এটা আমাদের নিজস্ব ঐতিহ্য। মঞ্চে দর্শক শ্রোতারা তার বক্তৃতা এবং বাঁশির সুর শুনে তন্ময় হয়ে পড়তেন। বাংলাদেশের সব ঐতিহাসিক আন্দোলনে তিনি তার গান দিয়ে মানুষকে উজ্জীবিত করার চেষ্টা করেছেন। ক্রান্তি শিল্পীগোষ্ঠী, গণশিল্পীগোষ্ঠীর সদস্য হিসেবে ষাটের দশকে বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে এবং ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে গণসংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে এক বিশেষ ভূমিকা পালন করেন।

গণঅভ্যুথান, ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ ও ৯০ এর সামরিক শাসনবিরোধী গণআন্দোলনে তিনি শামিল হয়েছিলেন তার গান দিয়ে। ষাট ও সত্তরের দশকে পাশ্চাত্যের আদলে পপ ঘরানার গানকে যে ক,জন শিল্পী জনপ্রিয় করে তোলেন ফকির আলমগীর তাদের মধ্যে অন্যতম। দীর্ঘ শিল্পী জীবনে তার কণ্ঠের বেশ কয়েকটি গান দারুণ জনপ্রিয়তা পায়। এর মধ্যেও সখিনা গানটি এখনো মানুষের মুখে মুখে ফেরে। কণ্ঠ দেওয়ার পাশাপাশি বেশ কয়েকটি গানের সুরও করেছেন তিনি। তার গাওয়া জনপ্রিয় আরও গানের মধ্যে নাম তার ছিল জন হেনরি, মায়ের একধার দুধের দাম, নেলসন ম্যান্ডেলা, সান্তাহার জংশনে অন্যতম। তিনি সাংস্কৃতিক সংগঠন ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা। এ ছাড়া তিনি বাংলাদেশ গণসংগীত সমন্বয় পরিষদের সভাপতি, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সহসভাপতি, জনসংযোগ সমিতির সদস্যসহ বেশ কিছু গুুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক সংগঠনের দায়িত্ব পালন করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর করা ফকির আলমগীর গানের পাশাপাশি নিয়মিত লেখালেখিও করেন। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও বিজয়ের গান, গণসংগীতের অতীত ও বর্তমান, আমার কথা, যাঁরা আছেন হৃদয়পসেহ বেশ কয়েকটি বই প্রকাশিত হয়েছে তার। সংগীতে বিশেষ অবদানের জন্য এ পর্যন্ত পেয়েছেন একুশে পদক, শেরেবাংলা পদক, ভাসানী পদক, সিকোয়েন্স অ্যাওয়ার্ড অব অনার, তর্কবাগীশ স্বর্ণপদক, জসীমউদদীন স্বর্ণপদক, কান্তকবি পদক, গণনাট্য পুরস্কার,পশ্চিমবঙ্গ সরকার প্রদত্ত মহাসম্মাননা, ত্রিপুরা সংস্কৃতি সমন্বয় পুরস্কার, ঢালিউড অ্যাওয়ার্ড যুক্তরাষ্ট্র, জনসংযোগ সমিতি বিশেষ সম্মাননা, চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ড বিশেষ সম্মাননা, বাংলা একাডেমি সম্মানসূচক ফেলোশিপ।

এদিকে ফকির আলমগীরের মৃত্যুর খবরে তার জন্মস্থান ফরিদপুরের ভাঙ্গায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অঙ্গন একজন কৃতিসন্তান হারানোয় স্থবিরতা নেমে এসেছে। এর আগে একাধিকবার তিনি ভাঙ্গায় কে, এম কলেজ, মহিলা কলেজসহ বেশ কয়েকটি অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করে দর্শকদের মাতিয়েছেন। বিশিষ্ঠ ব্যাক্তিরা তার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে শোক প্রকাশ করেছেন।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর